উচ্চ শিক্ষা নাকি উপহাস?

নিউজ ও ইভেন্ট
 নুরুজ্জামান খান : বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে প্রতিবছর সরকারি এবং বেসরকারি খাতে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকে শুরু করে এর ব্যাপ্তি শেষ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে। শিক্ষা যে ব্যবসায় রূপান্তর হয়েছে সেটা বুঝতে বা বলতে পণ্ডিত হতে হয় না। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা মীমাংসা করছি।

একটি ছোট বাচ্চার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে কয়টা বই লাগে দয়া করে একটু খোঁজ নেবেন। এখন যদি ৫০টা বইও লাগে তাতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু এই বইগুলো দেওয়ার পিছনে কী কী যুক্তি এবং বিশ্লেষণ রয়েছে তা কর্তৃপক্ষ কি কখনো রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহিতা দেয় অথবা যারা আইনপ্রণেতা তারা কি কখনও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে? এর সঙ্গে সম্পূরক প্রশ্ন, এই যে অহেতুক বই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো কেন একেক বিদ্যালয়ে একেক রকম? শিক্ষার্থীর বেতনের কথা আর নাই বললাম। এভাবেই আমরা ছোটবেলা থেকেই জানার বৈষম্য দিয়ে শ্রেণী ব্যবধান রচনা শুরু করছি।

উচ্চ শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করতে হলো, কারণ বীজ না দেখা গেলে ফসলের প্রকৃতি এবং উৎপত্তি বোঝা যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষা যদি ব্যবসায় হয় তাহলে এইটা কি খারাপ? আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো শব্দে বিশ্বাসী না বরং কার্যকারিতা এবং কাজের ধরন একটা শব্দের নামের সার্থকতা নির্ণয় করে। যেমন: ইংরেজি শব্দ Business (বিজনেস) এসেছে  ‘being busy’ বা ব্যস্ত থাকা ধারনা থেকে। আধুনিক বিশ্ব এই ব্যস্ত থাকাকে রূপ দিয়েছে সার্ভিস বা সেবা প্রদানের মাধ্যমে। এখন ধরে নিলাম, আমাদের দেশে শিক্ষা এক ধরনের বিজনেস বা ব্যবসা। তাহলে প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীরা শিক্ষার যে সেবা পাওয়ার কথা তা কি তারা পাচ্ছে? এর উত্তর দেওয়ার আগে আমি একটু উচ্চ শিক্ষার ধারনাটা ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছি।

উচ্চ শিক্ষা আসলে কী? উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কী ধরনের হওয়া উচিত? এই যুগে বাংলাদেশের মতো দেশে আসলে কী ধরনের সেবা দেবে অথবা কি ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত?

প্রথমত, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে উচ্চ শিক্ষার পরিমাপক হিসাবে ধরা হয়। যা শুরু হয় স্নাতক (সম্মান) বা অনার্স পর্যায় থেকে তারপর স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স, এমফিল এবং ডক্টরেট পর্যায়ে গিয়ে শেষ হয়। উচ্চ শিক্ষার ধারনাটা মূলত পুরোটাই পাশ্চাত্যের উন্নত বিশ্ব থেকে ধার করা। এর কারণ সবসময় যে বুঝেই আমরা ধার করছি তা কিন্তু নয়। সেটা যদি হতোই তাহলে আমাকে এই বিষয়ে লিখতে হতো না। এই যেমন স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্সের পরের ধাপগুলো এখনো আমরা আর কোনো বাংলা রূপ দিতে পারিনি।

ডক্টরেট মানে কি তার কোনো জাতীয় বাংলা শব্দ নেই। এর মানে আগেই বলেছি শব্দ তৈরি হয় এর কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে। ডক্টরেটের বাংলা শব্দ শ্রুতিমধুর হবে কি হবে না, তার থেকে বড় কথা হলো যখন শব্দ নিয়ে চিন্তা করা হবে তখন কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করা হবে। যেমন: মাছ শব্দ শুনলে আমরা বুঝি পানির বা জলজ প্রাণী। যেহেতু ডক্টরেটের কোনো জাতীয় অর্থ নেই, তাই এর প্রকৃতি এখনও জানি না…এটা কি পানিতে থাকে নাকি ডাঙায়? অথবা এটা দিয়ে কী হয়? যা হয় তা পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারনাকে শিক্ষার নামে বোঝা হিসাবে ধারণ করা। কারণ যখন আপনি তাদের সংস্কৃতি বুঝবেন না, খাবার থেকে সব কিছুতে ভুরূ কুঁচকে থাকবেন কিন্তু শিক্ষাটা নেবেন। এটা আসলে অনেকটা আনারস না ছিলে খাওয়ার মতো। কল্পনা করা যায় কিন্তু বাস্তবে আর কার্যকর হয়ে উঠে না।

এখন প্রশ্ন হলো, ধার করার কারণ কী? ধার করার প্রধান কারণ ব্রিটিশ শাসন এবং তাদের নীতিতে শিক্ষানীতি প্রস্তুত। তার সঙ্গে আমরা আমাদের নিজেদের কাজের এবং অন্ন সংস্থান করার জন্যে সেসব উন্নত দেশে ভিড় করেছি এবং ভাসা ভাসা যা পেরেছি তাই তুলে নিয়ে এসে শিক্ষার নামে নকল করা ধ্যান-ধারনা বিক্রি করে দিয়েছি। এ জন্যেই এটি ব্যবসা হিসাবে গণ্য হয়েছে। যেহেতু নকল করা তাই ব্যবসায়ের যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য ‘সেবা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকা’ তা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হয়ে ধান্দাবাজিতে রূপ নিয়েছে।

এখানে লক্ষণীয়, ব্রিটিশরা শিক্ষানীতি তৈরি করলেও তারা নিজেরা সেটা চালিয়ে যেতে পারেনি। এই লাইনটা দিয়ে আসলে বোঝাতে চাচ্ছি, যে বা যারা একটা নীতি তৈরি করবে তারা তাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং অভিজ্ঞতার আলোকে নীতিটি তৈরি করে। তারা তাদের অভিজ্ঞতার এক বা একাধিক অংশকে ভিত্তি করে একটা পদ্ধতি তৈরি করে এবং সেই মোতাবেক তথ্য দিয়ে মানুষের চিন্তার একটা লেয়ার বা স্তর তৈরি করতে সাহায্য করে। সমাজের মানুষ যেন সেই স্তরের উপর ভিত্তি করে আরেক স্তরে যেতে পারে অথবা তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে সেই লক্ষ্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই নীতি কিন্তু কোনো স্রষ্টার ধ্রুব সত্য বা বাণী নয় আর এ কারণেই সময় করে সেটা হালনাগাদ বা আপডেট করার প্রয়োজন পড়ে। এখন যাদের দ্বারা এই কাঠামোটি তৈরি এবং অন্য যারা এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করছে, তাদের থেকে যাদের দ্বারা এটি তৈরি তারা অনেকগুণ সচেতন থাকে কোথায় এটা কাজ করবে অথবা কাজ না করলে এর পরের ধাপে কী করতে হবে। এখন দেশের সামাজিক নীতির অবস্থান এখান থেকেই শুরু এবং শেষ হয় রাষ্ট্রীয় আইনে গিয়ে। উদাহরণ দিলে বিষয়টা সহজ হবে। আমাদের দেশের ট্রাফিক আইন বা পরিবহন আইনের অবস্থা যাচ্ছেতাই। পরিশ্রমী ট্রাফিক আইনের লোকজন না থাকলে রাস্তাতেই জীবন কাটাতে হতো আর সময় করে বাসায় ছুটিতে আসতে হতো। এর জন্যে কাকে দোষ দেব? সরকার, জনগণ অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? চিন্তার গভীরে গেলে কাউকেই দোষ দেওয়া যাবে না।

পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাই পাশ্চাত্য থেকে ধার করা কিন্তু সেসব দেশে কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের রাস্তায় নেমে বিশাল যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় না। আবার আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় অশিক্ষিত মানুষটি যখন উন্নত বিশ্বে কাজ করতে যায়, তখন প্রথম দিন থেকেই সে ট্রাফিক আইন মেনে চলে। এখন অনেকে বলতে পারে ওই দেশের আইন কঠিন। কথাটা সম্পূর্ণ সত্যি নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডাহা মিথ্যা। পরিবারের সম্পর্ক আইন দিয়ে তৈরি হয় না বরং শিক্ষা দিয়ে হয়। এখন সমাজকে একটি বড় পরিবার ধরলে বিষয়টি আরও সহজ হয়। পৃথিবীর কোনো দেশই শুধু কঠিন আইন দিয়ে দেশের ভেতর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। প্রথমত, কোনো দেশই সেই অর্থের যোগান দিতে পারবে না। তার চেয়ে অনেক অনেক সহজ শিক্ষা দিয়ে একটা তথ্য এবং চিন্তার পরিবেশ দিয়ে আশপাশের সব কিছুকে অনুধাবন করা। তো শিক্ষাটা কি? যা বলা হবে তার অর্থের সঙ্গে কার্যকারিতায় মিল থাকবে। মূলত কথায় এবং কাজে সত্য হবে।

এখন এই ধারনা নিয়ে যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই তাহলে সবখানে সর্বত্র দেখি কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। সার্টিফিকেট দিয়ে বলে দিলাম শিক্ষিত কিন্তু বেকার হয়ে পথে পথে লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে ঘুরছে এবং আমরা শিক্ষকরা বলছি, মাস্টার্স পাশ করে একটা আবেদনপত্র লিখতে পারে না চাকরি কীভাবে হবে? জনাব, শিখানোর দায়িত্বটা কিন্তু আমাদের ছিল। শিক্ষার্থী যদি আগে থেকেই জানতো তাহলে তো আর আমাদের কাছে আসার প্রয়োজন ছিল না। আর আমাদের শিক্ষার উপর বিশ্বাস নাই বলেই প্রথম বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীর সঙ্গী হয় বিসিএস গাইড বই।

এখন এতো কথা বলার কারণ হলো, প্রত্যেক দেশের মানুষ ভিন্ন, ভিন্ন তাদের জলবায়ু এবং জীবন ব্যবস্থা। কাজেই, শিক্ষানীতি হওয়া উচিত এই বিষয়গুলো উপর ভিত্তি করে। বিদেশে গিয়ে আমাদের শ্রমিক পড়াশোনা না জানা সত্ত্বেও টাকা রোজগার করতে পারে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খুলতে পারে এবং তার সঙ্গে বৈধ উপায়ে টাকা পাঠাতে পারে, কারণ সেসব দেশ মানুষ নিয়ে গবেষণা করে তাদের জীবনযাপনের পদ্ধতিগুলো আবিষ্কার করেছে। যারা আবিষ্কার করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে অথবা সেখানে ছাত্র-শিক্ষক মিলে চিন্তা করে কীভাবে জীবন ব্যবস্থা আরও জনবান্ধব করা যায়।

উপরের কথাগুলো যদি বুঝতে পারি তাহলে আমাদের শিক্ষানীতির অন্যতম একটা বিষয় হওয়ার কথা ছিল ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর আর সেটা শুরু হওয়ার কথা ছিল স্কুল পর্যায় থেকে। শুধুমাত্র ট্রাফিক পুলিশই আইন শিখবে এবং এ ব্যাপারে শিক্ষা নেবে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে শিক্ষানীতির বৈষম্য। অনেকটা রাজার নিয়মের মতো। একটা বিশেষ শ্রেণীর জানা মানে শিক্ষা নয় বরং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল।

এখন বলে দিচ্ছি, কেন এই শিক্ষা আমাদের দেশে হচ্ছে না। প্রথমত, আমরা জানিই না। জানলেও হীনমন্যতায় ভুগি, কারণ বহির্বিশ্বে তো এই শিক্ষা নেই। আর ভাই, আর কত বাইরের মানুষের পারপাস বা উদ্দেশ্য মিটিয়ে যাব? ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার থেকেও অনেক বড় সমস্যা ট্রাফিক। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি না বুঝলে রাস্তা, উড়ন্ত পথ তৈরি করে কোনো লাভ হবে না। বহির্বিশ্বে এই শিক্ষা কিন্তু স্কুল পর্যায়ে দেওয়া হয়, কারণ তারা একটা পর্যায়ে চলে এসেছে। আমরা যেহেতু আসতে পারিনি, তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিলেও ক্ষতি দেখি না। গরীব মানুষের কিন্তু প্রাইভেট গাড়ি নেই বা চালায় না। তাই তাদের আইন ভাঙার প্রশ্ন আসে না। আমাদের সমস্যার উপর ভিত্তি করে শিক্ষানীতি তৈরি করতে হবে আর তা না হলে প্রলয় আসছে। যেই প্রলয় আমাদের শক্তিশালী ব্রেনগুলোকে অকেজো করে শ্রমিক বানিয়ে রাখবে অথবা মিথ্যা অহংকারের বড় সরকারি অথবা বেসরকারি কর্মকর্তা।

এর পরের পর্বে বলব আমাদের শিক্ষানীতি আসলে কী ধরনের হওয়া উচিত? কেন আমাদের শিক্ষার্থীরা বাইরে পড়াশোনা করেও ভালো কিছু করতে পারছে না শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া? এতে কী কী সমস্যা হবে?

নুরুজ্জামান খান, চলচ্চিত্রকার, পিএইচডি গবেষক এবং শিক্ষক, হাঙ্গেরিয়ান ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস।

khan.bappy@gmail.com

Leave a Reply