লাইব্রেরিতে যত খুশি বই রাখতে আর বুক শেল্ফ লাগে না।

Article বাংলাদেশ

শুভস্মিতা কাঞ্জী |  গতবছর বইমেলার পর মা রীতিমতো হুমকি দিয়ে বলেছিল, নতুন বই কেনার আগে একটা নতুন বুক শেল্ফ বাড়িতে ঢোকাতে হবে। তারপর যেন নতুন বই কেনা হয়। অন্যথায়, বাড়িতে নতুন বইয়ের প্রবেশাধিকার নাও মিলতে পারে! অবশ্য মায়ের কথা ফেলনা নয়, বই এনে রাখব কোথায়? চিন্তার বিষয় স্থান সংকুলান! এদিক থেকে পিডিএফ অনেক ভাল। কিন্তু আমি যে আবার পিডিএফ পড়তে পারি না তেমন। তবুও চেষ্টা করে দেখলাম, ভালই লাগল। এর একটা সুবিধা হল, যেখানে সেখানে বই পড়া যায় সময়ে অসময়ে, সঙ্গে বইতে হয় না। কিন্তু তাই বলে হার্ড কভার বুক সম্পূর্ণ ত্যাগ করব, এটা ভাবতে গেলেই যেন আঁতকে উঠি। বইয়ের দোকান, কলেজ স্ট্রিট, বইমেলায় ঘুরে ঘুরে নতুন বই কিনব না, ফোন থেকে সব বই পড়ব, তা আবার হয় নাকি! কিন্তু তাইই তো হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় আবার বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায় এমন গ্রুপও তৈরি হয়ে গেছে। কত মানুষ তাদের পছন্দ মতো বই ডাউনলোড করে নেন সেখান থেকে। তার উপর লকডাউন আর আমপান এসে ঘা দিয়ে গেল। দোকান বা কলেজ স্ট্রিট যাওয়ার উপায় নেই, ফলে দেখলাম অনেকেই হার্ড কভার বইয়ের বদলে পিডিএফ বুক বানিয়ে বিক্রি করছেন, কেউ স্রেফ নিজের লেখা মানুষের কাছে এই উপায়ে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, কেউ আবার এই বই বিক্রি করে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তা নানান সামাজিক কাজে ব্যবহার করেছেন। তাহলে কি এটাই আগামী দিনের ট্রেন্ড হতে চলেছে? পিডিএফ বা ই-বুক? কী মনে করছেন লেখক এবং প্রকাশকরা? 


 
লেখক নির্মাল্য সেনগুপ্ত যেমন বলছিলেন, “আমপান পরবর্তী সময়ে ভারত, বাংলাদেশ মিলিয়ে প্রায় 500-র ওপর ম্যাগাজিন, বই পিডিএফ আকারে বেরিয়েছে। আমাদের পত্রিকা সমন্বয় তো বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছিল, তখন সেটা দেখে আমারও মনে হয়েছিল যে, তবে কি এটাই আগামী দিনের ট্রেন্ড হতে চলেছে? তখন আমার এক পরিচিত প্রকাশক দাদা বললেন যে, সমন্বয় 3000-এর বেশি কপি বিক্রি হলেও সেই পিডিএফ 300 জনও পড়েছেন কিনা সন্দেহ! পিডিএফ সব থেকে বেশি ব্যবহৃত হয় বাংলাদেশে, কারণ ওদেশে সাহিত্য চর্চা অনেক বেশি হয়। এছাড়া বিদেশে ই-পাব চলে খুব, আমাদের এখানে কিন্ডেল আছে। আমার মতো অনেকে আছেন, যারা রোজ কিছু না কিছু পড়েন। তাদের পক্ষে এত বই কেনা সম্ভব নয়, আর সম্ভব হলেও রাখবে কোথায়? আমি যেমন পিডিএফ ছাড়া অচল। কিন্তু আমার মতো মানুষের সংখ্যাটা কম। আস্তে আস্তে সবই ডিজিটাইজড হয়ে যাচ্ছে। এটা একদিকে প্রকৃতির জন্য ভাল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন যে পিডিএফ বুকের ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে তা হয়তো কিছু দিনেরয। মানুষ এখন কলেজ স্ট্রিট যেতে পারছে না তাই। এ ক্ষেত্রে এখনই কোনও আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।’


 
কবি অভিষেক করও প্রায় একই মত পোষণ করেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি জানান, কেন এই পিডিএফ বুক ট্রেন্ডিং এখন। তিনি বলেন, “অনেক সময় প্রকাশকরা 2-3 বছর দেরি করে ফেলেন রয়্যালটির টাকা দিতে, বা অনেক সময় মোট কটা বই বিক্রি হল তার হিসেব দেন না। সেটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া যাদের পরিচিতি বেশি তাদের লেখা বই আকারে ছাপা হয় লেখার মান না দেখেই, কারণ সহজে বিক্রি হবে বলে। সেটাও অনেকের মনে ক্ষোভ তৈরি করে। তারপর বইয়ে বানান ভুল থাকলে তার সমস্ত দায় লেখককেই নিতে হয়। ফলে অনেকে মনে করছেন সব যখন আমাকেই করতে হবে, তাহলে কেন নিজেই পিডিএফ আকারে বই বের করব না? কিন্তু এতে যে আখেরে তাদেরই ক্ষতি হচ্ছে, সেটা তারা বুঝছেন না। হয়তো তার লেখা তার পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এইভাবে লেখক যে অর্থ উপার্জন করতে পারত, তা হচ্ছে না অনেক সময়েই। তার থেকে বই থাক, বই মানে তো দু মলাটে বন্দি কিছু কাগজ নয়, সেটা আবেগ। যেখানে লেখাগুলোকে স্পর্শ করা যায়, নতুন বইয়ের গন্ধ পাওয়া যায়। সারাক্ষণ কাজ, বিল পে করা, সোশাল মিডিয়া দেখার পর বইটাও যদি ফোনে পড়তে হয় কিছুই বলার নেই। আমি চাইব হার্ড কভার বইই থাক।’


 
ঠিকই তো, বই অনেকের কাছেই আবেগের, যত্নের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তো তাল মিলিয়ে বদলাতেই হয়। কিন্তু সেই বদল কতটা কাম্য, বা সেই বদলকে কী ভাবে দেখছেন প্রকাশক এবং বার্তা প্রকাশনের কর্ণধার সৌরভ বিশাই? সৌরভ বলেন, “বিপদকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে পিডিএফ বই বানিয়ে, তা বিক্রি করে সেই অর্থ তাদের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে। যেমনটা আমপান পরবর্তী সময়ে হয়েছিল। কিন্তু কেউ এখন পিডিএফ বই বানাতে চাইলে বলব তা অবাস্তব। পিডিএফ কিন্তু লিগ্যাল নয়। 1985 সালে একটা রায় বেরিয়েছিল, যাতে বলা আছে পাইরেসি অপরাধ। আর পিডিএফ বাজারে এলে তা আটকানো যাবে না। ছড়িয়ে পড়বেই। প্রকাশক হিসেবে জরুরি সময় ছাড়া পিডিএফকে কখনওই সমর্থন করব না। তা ছাড়া আমপানের পর পিডিএফ বিক্রি করে ক্রাউড ফান্ডিং করা হয়েছিল কলেজ স্ট্রিটের বই বিক্রেতাদের পাশে দাঁড়াতে। এটা করতে গিয়ে উল্টে তাদের যে ক্ষতি করা হল, এটা অনেকে বুঝল না। পিডিএফ ট্রেন্ডিং হলেও তা তো আর কলেজ স্ট্রিটে কিনতে পাওয়া যাবে না। তখন এই বই বিক্রেতাদের কী হবে? তবে হ্যাঁ, আমি ডিজিটাইজেশনে বিশ্বাসী। সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে, কিন্তু তা পাইরেসিকে মদত দিয়ে নয়। 90-এর দশকের কথা মনে আছে সবারই, সিডির এত পাইরেসি হত যে, সিডি উঠেই গেল। তার বিকল্প হিসেবে এখন ইউটিউব উঠে এসেছে। কিন্তু তাই বলে বইয়ের বিকল্প কখনওই পিডিএফ হতে পারে না। তবে, এখন কিন্ডেল, ই-পাব আছে, যেখান থেকে পাইরেসি করা সম্ভব নয়।’ বইচই প্রকাশনার কর্ণধার, প্রকাশক ও লেখক অভীক সরকার সৌরভ বিশাইয়ের সঙ্গে একমত। কোভিড পরিস্থিতিতে যারা বাড়ির বাইরে বেরোতে পারছেন না, কিংবা যারা কলকাতার বাইরে থাকেন, তারা বর্তমানে ই-বুক নিয়ে খুব মেতে উঠেছেন। অভীক সরকার জানাচ্ছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলালেও কী ভাবে ক্ষতি হতে পারে বই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের। তিনি বলেন,”যে মুহূর্তে ই-বুক আসবে সেই মুহূর্ত থেকেই বই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন। প্রেস, বাঁধাই কর্মী, মুটে, রিটেল হাউজগুলো- এদের অনেকেরই তখন আর কাজ থাকবে না। এটা একটা বাধা ই-বুকে উত্তরণ হওয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু সেই বাধার জন্য তো আর টেকনোলজি আটকে থাকবে না, সে তার নিত্যনতুন অগ্রগতি নিয়ে আসবেই। তাকে থামাতে চাওয়া মূর্খামি হবে। তবে হ্যাঁ, কলকাতার অনেক প্রকাশকই ই-বুকের বিপক্ষে, তারা বিষয়টা ভাল করে বোঝেন না। ই-বুক আর পিডিএফ এক নয়। এছাড়াও ই-বুক পাঠকদের জন্য কতটা সুবিধাজনক হবে, সেটাও দেখার। তারা কি আদৌ অ্যাপ ডাউনলোড করে সেখান থেকে বই পড়তে স্বচ্ছন্দবোধ করবেন? আর বই পড়া তো ফেসবুক করার মতো না যে, একটু দেখে রেখে দিলাম। একটানা ফোনের আলোয় পড়তে গিয়ে কোনও সমস্যা হবে কিনা তাও দেখার। যতক্ষণ না কিন্ডেলের মতো কোনও কিছু আসছে, যেখানে বাংলা বই পড়া যাবে ততক্ষণ আমি অন্তত ই-বুক নিয়ে আশাবাদী নই।’


 
অভীক সরকার যেমন ই-বুক নিয়ে আশাবাদী নন, তেমন সৌরভ বিশাই আবার বাঙালির বই পড়ার হিড়িক আর বইমেলা থেকে বই কেনা নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। তিনি বলেন, “বাংলায় 10 কোটি মানুষ। সেখানে বইমেলায় 25-26 কোটি বই বিক্রি হয়, লকডাউনেও বই বিক্রি বেড়েছে। এই বিষয়গুলো দেখে আমি যথেষ্ট আশাবাদী। এখনই ই-বুক, পিডিএফ নিয়ে ভাবার সময় আসেনি। বইয়ের বিকল্প কিছুই হয় না যে। তবে সাহিত্যের বইয়ের বিক্রি বাড়লেও একাডেমিক বই বিক্রির গ্রাফ নিম্নমুখী। সরকার বহু বইকে ডিজিটাল করে দিয়েছে। ফলে যারা সেই বই ছাপিয়েছেন তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।’


 
লেখক এবং প্রকাশকদের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, কিছু কিছু বদল এলেও, বা আগামী দিনে আরও কিছু বদল আসার সম্ভাবনা থাকলেও, এখনই তা চিন্তার বিষয় নয়। বইপোকারা এখন তাদের পছন্দ মতো হার্ড কভার বই পাবেন, চাইলে পিডিএফ কিংবা ই-বুকও।

Leave a Reply